রাজনীতির অলিন্দে কান পাতলেই ‘টিকিট-কীর্তন’ মেদিনীপুর থেকে পাহাড়, ঘাসফুল শিবিরে এখন ‘পারফরম্যান্স’ বনাম ‘গ্ল্যামার’ ধাঁধা
বাংলার রাজনীতির মহাকাব্য কি এবার নতুন কোনও মোড় নিতে চলেছে? ২০২৬-এর নির্বাচনের ঘণ্টা বাজার আগেই গোটা রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে এক অলিখিত স্নায়ুযুদ্ধ। মেদিনীপুরের দুই জেলার ১৬ ও ১৫— মোট ৩১টি আসনের রেষারেষি সামনে আসতেই জানা গেল এটা তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র; উত্তর থেকে দক্ষিণ, বাংলার ২৯৪টি আসনেই এখন তৃণমূলের অন্দরে ‘টিকিট-লটারি’র ভিড়। নেতাদের গন্তব্য এখন গঙ্গার ধারের নবান্ন নয়, বরং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিট বা কালীঘাটের অন্দরমহল।
মেদিনীপুরের নেতারা যখন জেলাশাসকের দপ্তরে উন্নয়নের ‘সার্টিফিকেট’ জমা দিতে ব্যস্ত, তখন মালদা বা মুর্শিদাবাদের বিধায়করা কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছেন স্রেফ নিজের অস্তিত্ব রক্ষায়। রহস্যটা দানা বেঁধেছে সেখানেই— দল কি এবার ‘পুরনো চাল ভাতে বাড়ে’ নীতিতে চলবে, নাকি ‘অভিষেক-মডেল’-এ নতুন রক্তের ইনজেকশন দেবে? পটাশপুর বা চণ্ডীপুরের মতো আসনে যেমন পুরনো সেনাপতিরা নিজের ঘর সামলাতে নাজেহাল, তেমনই উত্তরবঙ্গের চা-বলয়ে প্রার্থী তালিকায় বড়সড় কাঁচি চলার গুঞ্জনে ঘুম উবেছে বহু ডাকসাইটে নেতার। ধাঁধাটা আরও জটিল হয়েছে ‘গ্ল্যামার’ ফ্যাক্টরে। তমলুক থেকে টলিউড— রাজনীতির ময়দানে হঠাৎই কিছু ‘অচেনা’ মুখের আনাগোনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অনেক পুরনো মহীরুহ এবার স্রেফ দর্শকাসনে ঠাঁই পেতে পারেন। দুই মেদিনীপুরের ১৬ ও ১৫ আসনের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, একেকটি আসনে দাবিদার অন্তত ৫ জন। এই ‘ওভারক্রাউডিং’ দশা এখন রাজ্যের সব জেলাতেই। কিন্তু ধাঁধাটা হলো অন্য জায়গায়— যাঁরা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে জেলাশাসকের দপ্তরে ফাইল ছুটাচ্ছেন, তাঁদের জনপ্রিয়তার গ্রাফ কি সত্যিই উর্ধ্বমুখী? নাকি নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে ব্যর্থ হয়ে এখন ‘প্রশাসনিক শংসাপত্র’-কেই শেষ অস্ত্র হিসেবে দেখছেন তাঁরা?
পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে যারা লোকসভা ভোটে ‘লিড’ দিতে পারেননি, তাঁদের কি ব্রাত্য করে রাখা হবে? এই প্রশ্নটাও ভাবাচ্ছে অনেককেই। তদ্বির না কি লড়াই নেতাদের মধ্যে কেন এখন এলাকার মানুষের চেয়ে কলকাতার ‘দাদা-দিদিদের’ খুশি করার হিড়িক বেশি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ "বাংলার রাজনীতিতে এখন এক অদ্ভুত ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ চলছে। মেদিনীপুরের নেতাদের প্রশাসনিক দৌড়ঝাঁপ আসলে হারানো জমি ফিরে পাওয়ার এক মরিয়া কৌশল। তবে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা ভোটারদের ইভিএম-এর আগে দলের স্ক্রিনিং কমিটির টেবিলেই নির্ধারিত হয়ে যাবে।"
শীতের শেষে বসন্তের হাওয়া দিলেও, বাংলার রাজনীতির অলিন্দে এখন শুধুই টিকিট পাওয়ার উত্তাপ। কে গদি বাঁচাবেন আর কে গদি হারাবেন— এই ধাঁধার সমাধান আপাতত নবান্ন আর কালীঘাটের রেড ফাইলের মধ্যেই বন্দি।
.jpeg)