তীব্র গরম বামেদের ব্রিগেডের মাথা ব্যাথার কারণ
আগামী ২০ এপ্রিল কলকাতা শহরের তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রির কাছাকাছি চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, সিপিএমের ব্রিগেডে আয়োজিত শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর এবং বস্তি সংগঠনগুলির সমাবেশটি যে এক বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে, তা স্পষ্ট। গরমে কর্মীদের রক্ষা করার জন্য সিপিএমের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খরচের কারণে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়েছে।
গরমে অস্থায়ী ছাউনি বা হ্যাঙারের ব্যবস্থা বাংলায় নতুন নয়। গত কয়েকটি নির্বাচনে তৃণমূল এবং বিজেপি দলের পক্ষ থেকেও এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে কর্মীরা রোদের হাত থেকে রেহাই পান। সিপিএমও প্রথমে পরিকল্পনা করেছিল, ব্রিগেডে হ্যাঙারের ব্যবস্থা থাকবে, কিন্তু যখন সেই খরচের অঙ্ক ওঠে, তখন তা আর বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। প্রাদেশিক কৃষক সভার সম্পাদক অমল হালদার জানিয়েছেন, ‘‘আমরা কথা বলেছিলাম ছাউনির ব্যাপারে। কিন্তু যে ভাড়া, তাতে আমাদের পিছিয়ে আসা ছাড়া আর কোনও পথ নেই।’’ অর্থাৎ, সিপিএমের পক্ষ থেকে বেশ কিছুটা খরচের কথা ভাবা হলেও, তা সামলানো সম্ভব হয়নি। তবে, এই সমস্যার সমাধানে সিপিএমের কর্মীরা ৫০ হাজার লাল টুপি তৈরি করেছে। তারা টুপি পরিহিত কর্মীদের মাঠের মাঝখানে বসাবে যাতে মাঠ খালি না দেখায়।
অমল হালদার আরও বলেন, ‘‘মাঠে-ঘাটে, কলেখারখানায় কাজ করা মানুষদের রোদে অসুবিধা হবে না। তারা অভ্যস্ত।’’ এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সিপিএম নেতারা নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের স্বাভাবিক পরিশ্রমী ও সংগ্রামী ভূমিকা তুলে ধরতে চাইছেন। সিপিএমের সাধারণ কর্মীরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করেন, তাদের জন্য রোদ কিছুই নয়। তারা গরমে কাজ করতে অভ্যস্ত এবং তাদের এই দৃঢ়তা এবং ত্যাগকে বিশেষভাবে সম্মানিত করতে চাইছেন বাম নেতৃত্ব।
এদিকে, সিপিএমের গণসংগঠনগুলির পক্ষ থেকে জেলা থেকে বাস এবং ট্রেনের মাধ্যমে জমায়েতকারীদের আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রবীণ নেতা অমিয় পাত্র জানিয়েছেন, কর্মীদের গামছা এবং জলের বোতল আনতে বলা হচ্ছে। এছাড়া, কর্মীদের ছাতা আনারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সিপিএম গরম থেকে কর্মীদের সুরক্ষিত রাখতে চাইছে নানা উপায়ে। সিপিএমের স্থানীয় স্তরের নেতৃত্বকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্লুকোজ নিয়ে মাঠে উপস্থিত হন।
তবে, যে বিষয়টি নজর এড়ানো উচিত নয়, তা হলো সিপিএমের ডিজিটাল টিম এই মুহূর্তে সংগঠিতভাবে মাঠের ছবি তুলছে। ড্রোনের মাধ্যমে ব্রিগেড সমাবেশের ছবি তোলা হচ্ছে, এবং বাম নেতৃত্ব সজাগ রয়েছে যেন মাঠের মাঝখানটি কোনোভাবেই খালি না থাকে। এই পরিকল্পনা একদিকে যেমন মাঠে বিশাল জমায়েত তৈরি করবে, তেমনি ছবি তোলার মাধ্যমে সিপিএম তার শক্তির প্রদর্শনও করতে চায়।
ব্রিগেড সমাবেশের ঘোষিত সময় বেলা ৩টা। প্রথম এক ঘণ্টা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি চলবে এবং তারপর বক্তৃতার পর্ব শুরু হতে হতে বিকেল ৪টা বেজে যাবে, যখন সূর্যের তাপ কিছুটা কমবে। তবে বৈশাখ মাসের বিকেল ৪টের রোদও একেবারে শীতল নয়। তবুও, এই সময়ের মধ্যে সভা শুরু হলে রোদের তীব্রতা কিছুটা সহনীয় হতে পারে।
তবে, সিপিএমের পরিকল্পনার মধ্যে আরও একটি বড় দিক রয়েছে, যা রাজনৈতিক সচেতনতা ও দলের আর্থিক অবস্থা নিয়ে। হ্যাঙার বা ছাউনির ব্যবস্থা না করার পিছনে যে আর্থিক সংকটের কারণ রয়েছে, তা নিশ্চিত। এক সময় সিপিএম সরকারে থাকাকালীন রাজ্যের নানা ক্ষেত্রে বিশাল অর্থনৈতিক খরচ ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক জেলা, যেমন হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, এবং অন্যান্য জায়গায় দল সঙ্কটে পড়েছে। সিপিএমের একাধিক গাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে, এবং এমনকি কিছু জায়গায় কর্মী নিয়োগ থমকে গেছে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে।
এছাড়া, সিপিএমের আরও একটি বড় প্রকল্প চলছে, যা হল নিউটাউনে জ্যোতি বসুর নামাঙ্কিত একটি গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করা। এই প্রকল্পে খরচও অনেক বেশি, এবং সেই অর্থ সংগ্রহের কাজও চলেছে। তবে, সিপিএমের ব্রিগেড সমাবেশে কোনও ধরনের বৈভব দেখানোর উদ্দেশ্য নেই। তারা মনে করে, নিজেদের সংগঠনের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক সচেতনতা একসঙ্গে চলছে।
সবশেষে, সিপিএমের এই আয়োজন একদিকে যেমন আর্থিক সমস্যাকে সামনে আনছে, তেমনি রাজনৈতিক সচেতনতার দিক থেকেও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উদ্দেশ্য শুধু সমাবেশের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং দলীয় মূলনীতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে এটি গুরুত্ব পাবে।
