Type Here to Get Search Results !

জঙ্গলমহলের ‘নিফটি’ মানেই ঝরা পাতা, অরণ্যের শুকনো ঘ্রাণেই ঘোরে অর্থনীতির চাকা


 জঙ্গলমহলের ‘নিফটি’ মানেই ঝরা পাতা, অরণ্যের শুকনো ঘ্রাণেই ঘোরে অর্থনীতির চাকা




 দুবাই বা মুম্বইয়ের শেয়ার বাজার কতটা উঠল বা নামল, তাতে যায় আসে না জঙ্গলমহলের। লালমাটির এই জনপদে সেন্সেক্স বা নিফটির সূচক নির্ধারিত হয় অরণ্যের মেঝেতে জমে থাকা শুকনো পাতার স্তূপ দেখে। যখন বসন্তের হাওয়ায় শাল-পিয়ালের বন ঝরা পাতায় ভরে ওঠে, তখনই জঙ্গলমহলের প্রান্তিক মানুষের ঘরে লক্ষ্মীলাভের সূচনা হয়।

​অরণ্যের ‘কারেন্সি’ বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক লক্ষ মানুষের কাছে এই শুকনো পাতা কেবল জৈব সার নয়, এটিই তাঁদের নগদ উপার্জনের প্রধান মাধ্যম। মূলত শাল পাতা সংগ্রহ করে তা দিয়ে থালা ও বাটি তৈরির কুটির শিল্পই এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বড় বড় প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে পাতা সংগ্রহ করার এই কর্মযজ্ঞই বুঝিয়ে দেয় এই মরসুমের আর্থিক স্থিতিশীলতা।

​বাজারের সমীকরণ অর্থনীতিবিদরা একে ‘ফরেস্ট ইকোনমি’ বললেও স্থানীয়দের কাছে এটি বাঁচার লড়াই। এক বস্তা শুকনো পাতার দাম এবং তা থেকে উৎপাদিত খোল-পাতার চাহিদার ওপর নির্ভর করে গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। উৎসবের মরসুমে বা বিয়ের লগ্নে যখন শালপাতার থালার চাহিদা বাড়ে, তখন জঙ্গলমহলের ‘সেন্সেক্স’ চড়চড়িয়ে ওঠে। উল্টোদিকে, অকাল বৃষ্টি বা দাবানলে পাতা নষ্ট হলে মধ্যবিত্ত বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও ধসের মতোই অবস্থা হয় এই আদিবাসী গ্রামগুলোর।

​হাড়ভাঙা খাটুনি ও ঝুঁকি ছবিতে ধরা পড়া দৃশ্যটি জঙ্গলমহলের প্রতিটি সকালের প্রতিচ্ছবি। কাঁধে বড় বস্তা নিয়ে মাইলের পর মাইল জঙ্গলে হাঁটা, বন্য হাতির আতঙ্ক এবং সাপের কামড়ের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই চলে এই সংগ্রহ। মহিলারা এই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কাকভোরে উঠে পাতা কুড়িয়ে এনে সারাদিন তা রোদে শুকানো এবং সেলাই করার মাধ্যমে চলে এক নিরন্তর সংগ্রাম।

​সংকটের মেঘ তবে এই অসংগঠিত অর্থনীতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট। ন্যায্য মূল্যের অভাব এবং উন্নত স্টোরেজ ব্যবস্থার অভাবে অনেক সময় জলের দরে পাতা বিক্রি করতে হয় সংগ্রাহকদের। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না লাগায় আজও এই ‘নিফটি’ অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল।

​পরিবেশ সচেতন মানুষের কাছে প্লাস্টিক বর্জন যখন একবিংশ শতাব্দীর ফ্যাশন, জঙ্গলমহলের কাছে তা আজন্মের সংস্কৃতি। এই শুকনো পাতাই প্রমাণ করে দেয় যে, প্রকৃত সম্পদ এসি ঘরের স্ক্রিনে নয়, বরং প্রকৃতির ধুলোমাখা ধরণীতেই মিশে আছে।

Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.