১৫ বছরের ‘মৌন-সাম্রাজ্য’ চন্দ্রকোনা রোডের বঞ্চনা ও কুড়মী আবেগের কাঠগড়ায় শালবনীর বিধায়ক
রাজনীতিতে পনেরো বছর একটি যুগ পরিবর্তনের সমান। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনী বিধানসভার অন্তর্গত চন্দ্রকোনা রোড এলাকায় রাজ্যের মন্ত্রী তথা টানা তিনবারের বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাতোর দেড় দশকের কার্যকাল যেন এক ‘স্থবিরতার মহাকাব্য’। উন্নয়নের চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনের আড়ালে থাকা জীর্ণ পরিকাঠামো এবং স্বজাতির মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর ‘রহস্যজনক নীরবতা’—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এখন জনমানসে তীব্র ক্ষোভের বিষ্ফোরণ ঘটেছে।
চন্দ্রকোনা রোডের মতো বর্ধিষ্ণু ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদে আজও একটি স্থায়ী থানা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন হাসপাতাল কিংবা আপদকালীন পরিস্থিতির জন্য একটি দমকল কেন্দ্র গড়ে না ওঠা নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জনপ্রতিনিধির ‘সদিচ্ছার অভাব’ বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। দেড় দশকেও কেন এলাকার মানুষকে সামান্য চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে ছুটতে হবে? কেন অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকায় দমকলের অপেক্ষায় ছাই হয়ে যাবে সাজানো সংসার? নাগরিক সমাজের তির্যক প্রশ্ন, "মন্ত্রীর পদের ওজন কি তবে কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ, এলাকার মাটিতে তার প্রতিফলন কোথায়?"
সবচেয়ে বড় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে কুড়মী সমাজের দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। জঙ্গলমহলের ভূমিপুত্র এবং স্বজাতীয় প্রভাবশালী প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীকান্ত মাহাতোর কাছে প্রত্যাশা ছিল পর্বতপ্রমাণ। কিন্তু কুড়মী জনজাতিকে ST (তফসিলি উপজাতি) তালিকাভুক্ত করার মতো সংবেদনশীল ও সাংবিধানিক দাবি নিয়ে বিধানসভার পবিত্র কক্ষের ভেতরে তাঁর ‘কৌশলী অবস্থান’ বা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ মেজাজ কুড়মী মহলকে শুধু হতাশ নয়, রীতিমতো অপমানিত করেছে। কুড়মী নেতৃত্বের সাফ কথা, “যাঁকে আমরা নিজেদের কণ্ঠস্বর ভেবে ক্ষমতার অলিন্দে পাঠিয়েছিলাম, তিনি পদের মোহ আর দলীয় শৃঙ্খলার চাপে স্বজাতির অস্তিত্বের আর্তনাদ শুনতে ভুলে গিয়েছেন।”
উন্নয়ন বনাম কুড়মীদের অস্তিত্বের এই লড়াইয়ে চন্দ্রকোনা রোডের অলিগলিতে এখন যে ‘অকর্মণ্য বিধায়ক বদল’-এর ডাক উঠেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পনেরো বছরের জমানায় প্রাপ্তির খাতা যখন শূন্য থাকে, তখন মানুষের ধৈর্যও শেষ সীমায় পৌঁছায়। অভিজ্ঞ এই মন্ত্রীর রাজনৈতিক সূর্যাস্ত কি তবে ঘনিয়ে আসছে? চন্দ্রকোনা রোডের হাওয়ায় এখন পরিবর্তনের সেই চড়া সুরই ক্রমশ বারবার প্রতিফলিত হচ্ছে।
