সম্পাদকীয়
রাজীবকে কেন মমতা রাজ্য সভায় পাঠাচ্ছেন - কূটনৈতিক মহল কি বলছে?
শুক্রবার রাতে তৃণমূলের ৪ জান রাজ্যসভার প্রতিনিধির নাম ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র আলোচনা। সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয় রাজীব কুমারকে নিয়ে। রাজ্যসভায় তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সাকেত গোখেলের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী এপ্রিল মাসে। আগেই পদত্যাগ করে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন মৌসম বেনজির নূর। এই চার আসনেই নতুন মুখ আনতে চলেছেন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। অতীতে বিভিন্ন পেশার পরিচিতদের রাজনীতিতে নিয়ে এসেছেন মমতা। কিন্তু রাজীবের মতো সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এবং 'বিতর্কিত' পুলিশকর্তার মনোনয়ন সাম্প্রতিক অতীতে সব চেয়ে বেশি নজরকাড়া। বাম আমলে নানা সময়ে রাজীবের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন মমতা। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর সেই রাজীবই ধীরে ধীরে মমতার 'আস্থাভাজন' হয়ে ওঠেন। সারদা কাণ্ডের শোরগোলের সময় তাঁকে 'আমার সেরা অফিসার' আখ্যাও দিয়েছিলেন মমতা।
রাজীবকে রাজ্যসভায় নেওয়ার পিছনে মমতার বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্যে কাজ করেছে বলেই কূটনৈতিক মহল মনে করেন।
* প্রথমত, সারদা মামলা তো বটেই, সম্প্রতি আইপ্যাক কাণ্ডেও রাজীবের নাম জড়িয়েছে। ঘটনাচক্রে, এই দুই মামলাতেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত তুঙ্গে ওঠে। তাই চাকরিজীবন থেকে অবসরের পর অনেকেরই আশঙ্কা ছিল, রাজীব হয়তো এবার কেন্দ্রীয় সরকারের রোষে পড়বেন। আইপিএস অফিসার এবং রাজ্যের ডিজি পদে থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে এতদিন যে পদক্ষেপ করা সম্ভব হয়নি, অবসরের পর এবার তাঁর বিরুদ্ধে সেই সব পদক্ষেপই করা হতে পারে। সে দিক দেখলে নিরাপত্তার প্রয়োজন ছিল রাজীবের। তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হলে সে রকমই কিছু নিরাপত্তা পাবেন।
* দ্বিতীয়ত,সম্প্রতি রাজীব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। এই ঘটনাকেই দ্বিতীয় কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। তাঁদের মত, রাজীবের মামলা যতটা না মানহানির ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি 'রাজনৈতিক'। কারণ, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এভাবে মামলা করা এতটাও সহজ নয়, যদি না পিছনে কোনও 'সাপোর্ট' থাকে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলার অর্থ আদতে কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই মামলা। তৃণমূলের মতো দলের সাংসদ হলে সমানে সমানে টক্করের জায়গা পাবেন রাজীব। মমতা তাঁকে সেই জায়গাই তৈরি করে দিলেন।
তৃতীয়ত, একটি কারণ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তা হল, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে সেতুবন্ধন করতে পারবেন রাজীব। প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশের দাবি, রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা নিয়ে রাজীবের কাছে বিস্তর 'ইন্টেল' রয়েছে। তাঁর নানা গোপন সূত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সীমান্ত এলাকায়। সংসদে গিয়ে এ সব বিষয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সমন্বয়ের কাজ অনায়াসে করতে পারে পারবেন।
* চতুর্থত, তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, রাজীবকে সংসদে পাঠিয়ে এ রাজ্যের অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকদেরও বার্তা দিলেন মমতা। তাঁদের যুক্তি, বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের 'চাপে' এ রাজ্যের অনেক উচ্চপদস্থ আধিকারিকই 'ভীত'। তাঁদের অনেকের বিজেপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও চলেন, যা মমতার সরকারের কাছে যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ। এই পরিস্থিতি রাজীবকে সংসদে পাঠিয়ে আসলে বার্তা দেওয়া হল যে, 'চাপের' মুখে নতিস্বীকারের প্রয়োজন নেই।
